Arunava Roy
Doordarshan Kendra Kolkata
ঈশ্বরচন্দ্র : ঈশ্বর কণা
বঙ্গ সমাজের ক্রান্তিকাল ঊনবিংশ শতাব্দী। ১২০৬ সাল থেকে যে নিদারুন পরাধীনতা বাংলা নামক দেশটিকে যুগে যুগে দ্বিধাগ্রস্ত করে রেখেছিল, তাকে নতুন দিগদর্শন দেখিয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দী। ১৮০০ সালে লর্ড ওয়েলেসলির আমলে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা এই কালখণ্ডের সূচনাপর্ব।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজে ইংল্যান্ড থেকে যে রাশি রাশি মানুষ ভাগ্যান্বেষণে ও রাজকার্যে এই ভারতে আসতেন, তাঁদের দেশীয় ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভৌগোলিক পরিচয়, দেশীয় গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা এসবের সঙ্গে প্রাথমিক ও মুখ্য সেতু ছিল এই কলেজ। বহু প্রথিতযশা মানুষ এই কলেজটিকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য যাঁরা, তাঁরা হলেন, উইলিয়াম কেরী (১৭৬১-১৮৩৪) ম্যাথু লুম্বডসেন (১৭৭৭-১৮৩৫), জন বোরথুইক গিলক্রিস্ট (১৭৫৯-১৮৪১), মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার (১৭৬২-১৮১৯), তারিনীচরণ মিত্র (১৭৭২-১৮১৩), লাল্লু লাল (কর্মজীবন ১৮১৫ থেকে), রামরাম বসু (১৭৫৭-১৮১৩) এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১)।
১৮২০ সাল একটি উল্লেখযোগ্য বছর। হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার তখন সবে তিন বছর। রাধাকান্ত দেব সহ কলকাতা শহরের বিদ্বৎসমাজ তার কিছুদিন আগে থেকে ঠিক করেন, সেটি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সমকক্ষ হবে, কারণ দেশীয় আলোকাকাঙ্ক্ষী নব্য যুবকদের জন্য একটি নতুন শিক্ষাকেন্দ্রের প্রয়োজন আছে। আর তাই এই কলেজের প্রতিষ্ঠা। ১৮০৯ সালে হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও এই কলকাতা শহরেই জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮২০ সাল থেকেই হিন্দু কলেজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক নতুন সামাজিক আন্দোলন শুরু করেন; ইয়ং বেঙ্গল নামে। ১৮২৪ সালে সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠা, হিন্দু কলেজ সংলগ্ন অঞ্চলেই।
এই আলোকপ্রাপ্ত কালখণ্ডে ইংরেজ সাম্রাজ্যের লন্ডনের পরেই সবচেয়ে জমজমাট নগর কলকাতা থেকে প্রায় ৫২ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে তৎকালীন মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর (বাংলা ১২ই আশ্বিন) এক শিশুর জন্ম হয়।
অত্যন্ত দরিদ্র কিন্তু সুশিক্ষিত এই পরিবার। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতা ভগবতী দেবী। পিতামহ রামজয় বন্দ্যোপাধ্যায়। রামজয়ের স্ত্রী দুর্গা। দুর্গা দেবীর বাবার বাড়ী বীরসিংহ গ্রামে। রামজয় সন্তানাদি হবার পর গৃহত্যাগ করেন। দুর্গা দেবী বীরসিংহতে বাবার বাড়ীতেই থেকে যান।
ঈশ্বরচন্দ্র এই বীরসিংহ গ্রামে তাঁর মা ভগবতী দেবীর সঙ্গেই শিশুকাল অতিবাহিত করেন। এক শিক্ষিত, দরিদ্র, সামাজিক বোধ সম্পন্ন, পারস্পরিক মর্যাদায় অটুট পারিবারিক সংশ্লেষে, বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবান জীবনে নিসিক্ত হয়ে, নারীজাতির প্রতি মমতাবোধ সম্পন্ন এক দৃঢ়চেতা মানুষের বেড়ে ওঠা, ঈশ্বরচন্দ্রের ব্যক্তিত্বকে সুগঠিত করে।
বাংলাদেশের এই সুগঠিত কৌম সমাজের ভিত্তি কিন্তু আজকের নয়। প্রায় ২০০০ বছর ধরে বাইরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন বাংলার গ্রামীণ জীবনের অন্তর্লীন শক্তি কখনো গতি হারায় নি। গুপ্ত যুগের সূচনাপর্ব থেকে যে সামাজিক ইতিহাসের পরিচয় আমরা পাই বিভিন্ন ঐতিহাসিকের রচনায় আর তার অন্বেষণে, সেখানে একটি জিনিস পরিষ্কার, এশিয়া মহাদেশের পরিবার ভিত্তিক মূল্যবোধ এই বাংলাতেও ছিল। পাশ্চাত্যের ব্যক্তিতন্ত্রের অহংকার সেখানে কখনোই পরিবার এবং সমাজের সামাজিক মূল্যবোধকে ছাপিয়ে যেত না।
রামজয়ের উত্তরাধিকার, সন্ন্যাসজীবনের উপরান্তে রামজয়ের সংসারে পুনঃপ্রবেশ, রামজয়ের পুত্র ঠাকুরদাসের অপরিসীম দারিদ্রের সঙ্গে যুঝে শিক্ষাগ্রহণ এবং নতুন শহর কলকাতা জীবিকাগ্রহণের উপযুক্ত স্থান, এই সবকিছুর সন্নিবেশ পরিবারটিকে শিকড়ের সঙ্গে বলিষ্ঠভাবে যুক্ত করেও আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে অসুবিধায় ফেলেনি।
ঠাকুরদাস-এর সৌভাগ্য, কলকাতায় বড়বাজারে যে কাজে তিনি এসেছিলেন সেখানে মাসমাইনে সামান্য হলেও নীতিভ্রষ্ট হবার কোন প্রলোভন ছিল না। সে ধরনের কাজ তিনি নিজে কোনোদিন করেন নি, পানও নি। শিক্ষা, কেবল শিক্ষাই যে একটি পরিবারকে আর্থিক মুক্তি এবং সামাজিক সম্মানে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, সেই বিশ্বাসে তিনি তাঁর প্রতিটি পুত্রকে কলকাতার সীমানায় নিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের পড়াশুনোর জগতে প্রতিষ্ঠিতকরেছিলেন।
১৮২৯ সালে ঈশ্বরচন্দ্রকে ঠাকুরদাস যখন বীরসিংহ থেকে প্রায় অনেকটা পথ পায়ে হাঁটিয়ে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন, তখন ঈশ্বরচন্দ্রের বয়ঃক্রম মাত্র ৯; আর সেই সময়ই শিলের বাটার মতন ফলক দেখে ঈশ্বরচন্দ্রের ইংরাজী সংখ্যা পরিচয় হয়েছিল, সে কথাও সর্বজনবিদিত। ব্যক্তিগতভাবে এই বালকটির ক্ষুরধারবুদ্ধি; অসম্ভব স্মৃতিশক্তি; চাঞ্চল্য এবং কিঞ্চিত দুর্মতিও ছিল। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই নারীজাতির প্রতি অসম্ভব সম্মান প্রদর্শন করতেন। যে ব্যবহার এযুগেও সুলভ নয়। আর ছিল অসম্ভব গোঁ, এঁড়েবাছুর, ঘাড়কেঁদো, বয়স্কদের এই সম্ভাষণও তাঁকে শুনতে হয়েছিল। কিন্তু পারিবারিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকার, সত্যের প্রতি অবিচল আস্থা তাঁকেও বর্তেছিল।
এইসব নিয়েই এই বালকের কলকাতা অভিযান। রামমোহনের থেকে ৪৮ বছরের ছোট, রামমোহনের মৃত্যুর সময় এই বালকের বয়স ১৩, আর রামমোহনের মৃত্যুর ৫৮ বছর পর ১৮৯১ সালে ঈশ্বরচন্দ্রের কালগ্রাস। এই সময়কালে বাংলা, ভারত এবং এশিয়া ভূখণ্ডেও ঔপনিবেশিক শাসনের বিপ্রতীপ মুখ দেখা দিয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসেও তাই ঊনবিংশ শতাব্দী বর্ণময়। চীন, জাপান, ভারত, অর্ধেক রাশিয়া, মুসলিম প্রধান দেশগুলির কয়েকটি একইসঙ্গে পুরোন সংস্কারকে জাড়িয়ে নিচ্ছিল ইউরোপের রেনেসাঁ – উপলব্ধ নব্য চিন্তাধারার সঙ্গে।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর কোম্পানীর বাংলা জয়, সঙ্গে ভারতবিজয়ের সময়ে ভারতবর্ষের উপরে নেমে এসেছিল সংগঠিত লুন্ঠন, অত্যাচার, শোষণ। হতচকিত বহুধাবিভক্ত ভারতবর্ষ যেন ছিল এক মৃগয়াক্ষেত্র। লুন্ঠনের প্রাথমিক উচ্ছ্বাস থেমে গেলে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সংস্কারের পথে হাঁটল। জমিদারী ব্যবস্থা পুনর্গঠন করে নিয়মসিদ্ধ লুন্ঠন চালু করল। যেন এক উদারনৈতিক শাসক নেমে এল এই ধরাধামে। প্রভুর অহমিকা, ঔদার্য্যের ছদ্ম আভিজাত্য ভারতীয় সমাজকে আরো জীর্ন করল, শীর্ন করল। এশিয়া মহাদেশে এই একই প্রক্রিয়া অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের শাসকেরা প্রতিষ্ঠা করল। অবারিত লুন্ঠনে ইউরোপ হল পৃথিবীর ড্রইংরুম।
কিন্তু সব ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। ১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ এরকমই একটি উদাহরণ। বাংলাদেশে পড়াশুনার যে জনপদগুলি ছিল, সেখানে যুগ যুগ ধরে পন্ডিতেরা সংস্কৃত ন্যায়শাস্ত্র, স্মৃতিশান্ত্রের শিক্ষা দিতেন। রাজ অনুগ্রহ থেকে সরে যাওয়া এই সংস্কৃতশিক্ষা প্রশাসনে সেরকম কাজে লাগছিল না। তাই রাজার ভাষা শেখার জন্য বঙ্গদেশের কিছু দুর্ধর্ষ মানুষ নানাভাবে নিজেদের প্রশিক্ষিত করবার প্রচেষ্টা নিলেন। রাজা রামমোহন রায়ের জীবন নিয়ে আলোচনা করলেই আমরা দেখতে পাই ১৭৭২ সালে জন্মগ্রহণ করে, রাধানগর নিবাসী কিশোরটি পাটনায় চলে গেলেন ফারসি শেখার জন্য, মাত্র ৯ বছর বয়সে। সময়কাল তখন ১৭৮১ সাল। সম সময়ের স্থলপথের দুর্গমতা তিনি অতিক্রম করেন জলপথের নাব্যতায়। কিন্তু এই দুঃসাহস, এই অদম্য জেদ বাঙ্গালীর মধ্যে সে যুগে ছিল। এই সময়ের বহুযুগ আগে দুটি নাম আমাদের মনে আসে, অতীশ দীপঙ্কর, চৈতন্যদেব।
ঈশ্বরচন্দ্র এঁদেরই পরবর্তী প্রজন্ম। সতীদাহ যদি রামমোহনের সক্রিয়তায় বন্ধ হয়, পরবর্তীতে বিধবা বিবাহ আইন সম্মত করার পেছনে ঈশ্বরচন্দ্রের অপরিসীম অবদান রয়েছে। শাস্ত্রের অপব্যাখ্যা করে যে বিধবা বিবাহ পুরুষসমাজকে যথেচ্ছাচার করার অনুমোদন দিয়েছিল, সেই শাস্ত্রেরই সঠিক ব্যাখ্যা করে তিনি বিধবা বিবাহকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
১৮৫১ সালে ঈশ্বরচন্দ্রের বয়ঃক্রম ৩১। সংস্কৃত কলেজের শিক্ষক। সংস্কৃত ব্যকরণ শেখার যে কাঠামোগত অসাড়তা ছিল, তাঁকে সরল, সুন্দর, স্বাদু করার কাজে ব্রতী হলেন তিনি। ব্যকরণ – কৌমুদী সেই শ্রমেরই নির্মাণ। বাংলাভাষা পড়ার কতকগুলি পাঠ্যপুস্তক ছিল সে যুগে। তার ভাষাও ভারী, আড়ষ্ট, প্রাণহীন। মার্শাল সাহেবের কথায় ১৮৪৭ সালে ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ অনুবাদ করলেন হিন্দী থেকে ঈশ্বরচন্দ্র। সেই জন্য ভাল করে হিন্দী শিখলেন। সেই সময়ে ঈশ্বরচন্দ্র যেন স্বর্ণপ্রসূ। সর্বমোট ৫২টি পুস্তক রচনা করেন। প্রথম গ্রন্থ বাসুদেব চরিত। বাঙ্গালার ইতিহাস বইটি প্রকাশিত হয় ১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দে। মার্সম্যান সাহেবের ইংরেজী বই-এর অনুবাদ। ভাষা প্রাঞ্জল ও মনোহর। জীবন চরিত, আখ্যানমঞ্জরী, চরিতাবলী, বোধোদয় এই বইগুলি একইসঙ্গে চরিত্রগঠন এবং প্রাথমিক ভাষা শেখার মূল স্তম্ভ। কিশোরীর বাল্যলীলা নবযুবকদের মনে স্থাপন হয়েছিল শকুন্তলা নামক সুললিত বইটির মূর্চ্ছনায়। ‘বিধবা বিষয়ক গ্রন্থ’ তাঁর সমাজ পরিশোধন করবার অস্ত্র। আবার ১৮৫১ সালে বিধবা বিবাহ আন্দোলনে দেশ যখন টলটলায়মান ঈশ্বরচন্দ্র তখন গভীর অনুধ্যায়ে প্রস্তুত করছেন বর্ণপরিচয়, কথামালা, চরিতাবলী। বাংলাভাষা কাঠিন্যমুক্ত হয়ে, সুললিত সরস এবং কল্পনাশক্তির বিকাশে সহায়ক হয়েছিল বিদ্যাসাগর প্রণীত ৩০ খানি পুস্তকের মাধ্যমে। সংস্কৃতভাষায় গভীর শিক্ষা থাকার জন্য আর ইংরেজী ভাষায় সুললিত গদ্যপাঠ করার কারণে ঈশ্বরচন্দ্রের বাংলাভাষা বহতা নদীর মতন উপলখণ্ডে মিষ্টি আঘাতে, নতুন নতুন ছন্দে বাঙ্গালী মানসকে সমৃদ্ধ করেছিল। তাঁর সময়ের পন্ডিতেরা পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত ভাষা ভগীরথের শিরোপা দিয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে।
একটা হিসেব জানাচ্ছে বই-এর রয়্যালটি বাবদ ঈশ্বরচন্দ্র সেই সময় ১৮৫১-৫৭ সালে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করেছেন, আর সেই টাকা মুক্ত হস্তে বিলিয়ে দিয়েছেন শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপনায়, বিধবা বিবাহ সম্পন্নে। এইসময় তিনি প্রভূত প্রবঞ্চনার শিকার হয়েছেন। কিন্তু মহৎ কাজ থেকে কখনো সরে আসেন নি। তাঁর যুক্তি ছিল, আমি তো দেশ হিতৈষনায় অর্থ ব্যয় করেছি, এরপর মানুষে যদি প্রবঞ্চনা করে তার দায়িত্ব তাঁদের, আমার নয়।
বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্রের চেয়ে আঠারো বছর ছোট। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর বঙ্কিম ছিলেন প্রথম স্নাতক দ্বয়ের একজন। গ্রেস মার্ক নিয়ে পাশ করার পর তিনি জানতে পেরেছিলেন বাংলা ভাষায় তাঁর নম্বর কম ছিল ঈশ্বরচন্দ্র পরীক্ষক হবার কারণে। তাই আজীবন অসদ্ভাব ছিল। শ্রী রামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সাক্ষাতে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন এই বলে, এতদিন তো পুকুর ডোবা দেখেছি, আজ সাগর দেখছি, আর সেই শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্য নরেন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন স্কুল থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন পড়ানোর অক্ষমতার অভিযোগে।
সমাজ – সভ্যতার প্রতিদিনের জীবন নানা খুঁটিনাটিতে ভরা থাকলেও যখন শতাব্দী – উত্তীর্ণ সময়কালে ঈশ্বরচন্দ্রকে বিচার করতে বলা হয়, তখন মনে হয় কালোত্তীর্ণ হবার সম্পূর্ণ গুণাবলী নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন। ১৮৭৩ সাল নাগাদ বীরসিংহে মুচিরাম বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিধবা-বিবাহ উপলক্ষে ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর কথা – না – রাখার অভিমানে গ্রাম ত্যাগ করলেন এবং অধুনা ঝাড়খণ্ডের অধীনস্ত কার্মাটাড়ে একটি বাড়ীতে বসবাস শুরু করেন। এই যাত্রায় তিনি পরিবারের কাউকেই সঙ্গে নিলেন না। ভাই শম্ভুচন্দ্র যেতেন মাঝে মাঝে। ঈশ্বরচন্দ্র সেখানকার আদিবাসী সাঁওতাল সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গেলেন। প্রায় ৩৫ মাইল রেডিয়াসে তিনি কার্মাটাড়ের দরিদ্র জনজাতির জন্য দুটি অমূল্য কাজ করেছিলেন। নিরক্ষরতা দূরীকরণ আর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রসার।
২০১৮ সালে দূরদর্শনের তরফ থেকে দুটি কাজে আমরা অগ্রসর হই। প্রথম, বিদ্যাসাগরের দু’শো তম জন্মবার্ষিকী ২০২০ সালে, আর দ্বিতীয় রাজা রামমোহনের দুশো পঞ্চাশ তম জন্মবার্ষিকী ২০২২ সালে। এই দুটির জন্য আগেভাগেই পরিকল্পনা, ভাগ্যিস এই পরিকল্পনা ২০১৮ সালে আমরা নিয়েছিলাম, কারণ তখন কেই বা জানত ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে কোভিড নামক একটি বিশ্বব্যাপী অতিমারী এই জগতকে বিপর্যস্ত করে তুলবে!
বিদ্যাসাগরের কথা বলি। বাদুড়বাগান, সংস্কৃত কলেজ, কলকাতা, মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রাম আর জামতাড়ার পাশ্ববর্তী কার্মাটাড় জনপদ যেখানে রেলওয়ে স্টেশনটি এখন বিদ্যাসাগর নামে ভূষিত। এই তিনটি জায়গায় দূরদর্শনের প্রোডাকসন টিম তন্নতন্ন করে শ্যুট করেছে আর পেয়েছে আশ্চর্য কিছু অমূল্য রতন। বাদুড়বাগান বিধ্বস্ত, সরকারী উদ্যোগে সংস্কার হওয়ার আশায় দিন গুনছে; বীরসিংহ গ্রাম বিদ্যাসাগর – চেতনায় উদ্ভাসিত। যদিও বিদ্যাসাগর নির্মিত ভগবতী বালিকা বিদ্যালয়টি জীর্ণপ্রায়, কিন্তু অবাক বিস্ময়ে দেখেছি আসানসোল থেকে চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভের পাশ দিয়ে মিহিজাম, জামতাড়া হয়ে কার্মাটাড়ে গিয়ে, অনুচ্চ, শস্যহীন, ঊষর জমিখণ্ডের রাস্তাধরে রেল স্টেশনের পাশেই ‘নন্দনকানন’ বিদ্যাসাগরের বাড়ীটি। বিদ্যাসাগর-পুত্র নারায়ণচন্দ্রের অবিমৃষ্যকারিতায় যে বাড়ীটি বেহাত হয়েছিল, স্বাধীনতার পরে বিহার সরকারের তৎপরতায় আর পাটনার বাঙ্গালী অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় উদ্যোগে এই বাড়ী এবং জমিখণ্ডটি বিদ্যাসাগরের স্মৃতিচারণে উদ্ভাসিত। কার্মাটাড়ের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে আমরা এমন সাঁওতাল পরিবারকে পেয়েছি যাঁদের পূর্বপুরুষ বিদ্যাসাগরের সান্নিধ্য এবং সেবা পেয়েছেন। শ্রুতিপদ্ধতিতে সেই ইতিহাস প্রজন্মের হাত ধরে আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে। ঈশ্বরচন্দ্র এই সম্পূর্ণ ভূখণ্ডটি পায়ে হেঁটেই অতিক্রম করতেন। বিশেষত উত্তরপাড়ার কাছে ১৮ শতকের পঞ্চাশের দশকে ঘোড়াগাড়ীতে অ্যাকসিভেন্ট-এর পর পদব্রজে স্থানান্তরণ ছিল তাঁর পরিচিত অভ্যেস। লোককথার মতন বিদ্যাসাগরের সেই অনুক্ত জীবন ধরা পড়েছিল দূরদর্শনের ক্যামেরায়। আর ২০১৯-এ দ্বিশতবর্ষ আরম্ভ হবার পূণ্যদিনে ডিডি বাংলায় সেটি দেখানো সম্ভব হয়। দর্শকদেরও অকুন্ঠ সমর্থন এবং সমাদর আমরা পাই।
ঈশ্বরচন্দ্রের পূর্ণজীবনকে নিয়ে আলোচনা করবার পরিসর এবং ধৃষ্টতা বর্তমান প্রতিবেদকের নেই, কিন্তু একথা সত্য তাঁর জীবন দেশে দেশে প্রচারিত হলে এ বিশ্বের মঙ্গল। যে অনৃতভাষণ, মেকী অহং সর্বস্ব জীবনের মুখোমুখি আমরা, তাকে প্রতিহত করতে আমাদের চাই ঈশ্বরচন্দ্রের মতন প্রতিভা, সত্যের প্রতি অবিচল আস্থা এবং অদম্য পরিশ্রম।
কিছু আশা করার আগে শুধু কর্মেই হোক আমাদের অধিকার।
তথ্যসূত্র :
১) গৌড় কাহিনী
শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ
ডি এম লাইব্রেরী ১৮৮৪ শকাব্দ
২) ঈশ্বরচন্দ্র প্রণীত
সমগ্র ভারত ও বিশ্বের ভূগোলবর্ণনা
ভূগোলখগোলবর্ণনম্
অনুবাদ ও সম্পাদনা অমিত ভট্টাচার্য
৩) শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন
বিদ্যাসাগর-জীবনচরিত
৪) বিদ্যাসাগর
শ্রী চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
About the author

Arunava Roy,a retired Group A officer from Doordarshan had studied Economics in Santiniketan,Visva-Bharati commenced his career with ISI,Kolkata,worked as Statistician,Labour Dept. Govt of West Bengal joined Akashvani through UPSC in 1991.Worked at Agartala,Panaji,Kolkata,Port Blair AIR kendras.He experienced Tsunami 2004 as broadcaster.Later he worked for Marketing wings of Prasar Bharati.In 2016 Sri Roy joined Doordarshan kendra Kolkata as Head of Programme.He also looked after the East Zone.During this tenure Sri Roy was instrumemtal to augments the viewrrship of this PSB Channel manifold.He introduced the Live Bengali commentary of Puri Rathayatra.Sri Roy is associated with different Universities as guest lecturer on media sciences. Sri Roy retired from service on 30.09.2022.

খুব সজীবতার সঙ্গে সেই সময়কাল, সেই দীপশিখার মতো স্থিতপ্রজ্ঞ, স্থিতসংকল্প মনীষীর জীবনে আলোকসম্পাত করা হয়েছে। সাথে সম-সময়ের অন্যান্য কুশীলবেরাও প্রতিফলিত। তাতে সেই সময়কার একটা চলমান ছবি পাঠকের মনে ধরা পড়ছে। খুব সুখপাঠ্য, খূব উপভোগ্য। লেখককে ধন্যবাদ। এবং আরো লেখার জষ্য অনূরোধ।
– অমিতাভ মৈত্র
যদিও আমার এবিষয়ে জ্ঞান একেবরেই সীমিত কিন্তু অরুণাভ বাবু তথ্য পেয়ে অনেক কিছু জানলাম । আমি জানি উনি দূরদর্শনে অনেক পরিবর্ত্তন করেছেন কিন্তু তথ্য সংগ্রহের এই ক্ষমতা আমায় ভীষণ প্ভাবিত করলো । অনেক ধনযবাদ?
তথ্য – নির্ভর সমকালের ইতিহাসের উপস্থিতি এবং অরুণাভবাবুর সুন্দর উপস্থাপনা প্রতিবেদনটিকে সজীব ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। এমন আরও ইতিহাস-পুরুষের কথা আশা করবো। ঈশ্বরচন্দ্র : ঈশ্বরকণা ই ।