বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা’র ভাল-মন্দ- পর্ব ২
প্রথম পর্বে বলা দিনরাত বাছুন-কিনুন এর চাপে নিজের সময় আর জীবনকে হারিয়ে ফেলার মোহময় ব্যূহ থেকে বেরোনোর উপায় নেই এমন নয়, তারা খুব অচেনাও নয় বরং চিরচেনা ধরণের। এবার সেই ব্যূহবন্দী আমাদের মনরূপী অভিমন্যু-কে উদ্ধারের কিছু উপায় খোঁজা যাক।
“স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা”
লোককবি থেকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী (Internal contradiction is the basic cause of change) সকলেই বলে কোন অসুবিধায় পড়লে কারণটি প্রথমে নিজের মধ্যে খোঁজ করো। নিজে-বেছে-নিন উপদ্রবের প্রধান উৎস ‘আমি ঠিক জিনিসটি ঠিক চিনতে পারব’ এই অহমিকা (বিনয় শুধু মহতের ভূষণ নয়, সাধারণের দৈনন্দিন প্রয়োজন)। বুঝতে হবে, প্রকৃতি আমাদের সর্বজ্ঞানী, সর্ববোদ্ধা করে তৈরি করেন নি। তা যদি করতেন, সুকুমার রায়ের বিদ্যে বোঝাই বাবুমশাই-কে নিরক্ষর মাঝির কাছে হীন হয়ে পড়তে হ’ত না, আর গুচ্ছের তথাকথিত অল্পশিক্ষিত এমন কি নিরক্ষর ব্যবসায়ী প্রচুর অর্থ রোজগার করে মার্সিডিজ-ফেরারি হাঁকিয়ে ঈর্ষাণ্বিত পণ্ডিতদের মনে ‘এ কি অবিচার!’ ধরণের নীরব অনুযোগ উৎপাদন করতে পারতো না।
নিখুঁতের নেশা থেকে মুক্ত হয়ে এটাও মেনে নিতে হবে যে ইতিহাসের পণ্ডিত ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে একটু ‘ঠকে’ যাবেন। যিনি অফার পেয়ে খুব সস্তায় ফ্রিজ কিনলেন, তিনি সেটি বাড়ি আনার জন্য সস্তার ভ্যান পাবেন না। যে মেয়েটি ‘সা-রে-গা-মা-পা’তে নেচে গেয়ে প্রশংসা পাচ্ছে সে টেবিল-টেনিস বা ক্যারম খেলতে নাকানি-চোবানি খাবে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘সবচেয়ে ভাল’টি যে একজনের পক্ষে করা সম্ভব নয়-আমার পক্ষেও নয়, সেই বোধটি এলে মন হালকা হবে, একটু ফুরফুরে মুক্তির বাতাসও বইতে থাকবে।
যেটি চাই সেটি না হলেও চলে, যেটি প্রয়োজন সেটি চাই না
অহিংস সংলাপ (Nonviolent communication) নামে একটি পদ্ধতি আছে। তার একটি মূল তত্ত্ব বলে আমরা যা চাই, তা আমাদের দরকার না-ও হতে পারে। ধরুন, আমি আজ পাঁচ তারা হোটেলে খেতে চাই, কিন্তু শরীরের প্রয়োজন দুটি রুটি আর এক বাটি তরকারী। নিজের ঠিক কি এবং কতটা দরকার সেটি জানলে, আর মারমুখী মানুষকে অন্তরের অন্তঃস্থলে ডুব দিয়ে যেটি চাইছেন সেটি-ই দরকার কি না খোঁজ নিতে বললে দু’পক্ষের-ই নরম হওয়ার, প্রাণের মাঝে লুকিয়ে থাকা সুধারাশি উচ্ছ্বসিত হবার অবকাশ সৃষ্টি হয়। তীব্র দুঃখ আর হিংসা ভোঁতা হয়ে মানবিক পরিমণ্ডল তৈরি হয়, বিশেষ কারও ভালবাসা বা আইআইটি না পেলে প্রতিবেশীর প্রতিভাবান সন্তানটি আত্মহত্যার উপায় খোঁজা থেকে বিরত হয়।
প্যারেটো আর এবিসি
১৮০০ শতকের শেষ দিকে (মতান্তরে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে) ভিলফ্রেডো প্যারেটো নামে একজন ইতালিয়ান অর্থনীতিবিদ লক্ষ্য করেন যে ইতালির ৮০% জমির মালিক সে দেশের ২০% মানুষ।

সে চিন্তা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেখা যায় বহু ক্ষেত্রেই ২০% জিনিষ ৮০% কে নির্ধারিত করে। যেমন ধরুন, আমাদের দিনের ৮০% কাজ হয় তার ২০% সময়ে, আলমারিতে রাখা কাপড়-জামার ২০%, ব্যবহৃত হয় জীবনের ৮০% সময়ে, কোন দোকানের ২০% জিনিস তার ৮০% আয়ের কারণ আর ৮০% স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা তাঁদের যন্ত্রে যে সব সুবিধে আছে তার মাত্র ২০% ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, কেউ যদি নিজের ইচ্ছে আর স্বপ্নের সাথে মিলিয়ে জীবনের প্রাসঙ্গিক ২০%-কে ধরতে পারেন তাহলেই কেল্লা ফতে, তাকে আর বাকি ৮০% নিয়ে ছটফট করতে হবে না। (ছবিটি অ্রন্তর্জাল থেকে নেওয়া )
২০% ছোটখাট বিষয় মুনিদের তপস্যা ভাঙ্গা অপ্সরাদের মত। তফাৎ এই যে তারা মেনকা-উর্বশী-রম্ভার মত ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ ধরণের সংখ্যায় মুষ্টিমেয় নয়। এরা অগুন্তি ‘সর্বদা দেখা পাই’ হয়ে আশেপাশে থাকে আর ক্রমাগত চুরি করতে থাকে আমাদের মনোযোগ আর সময়। একটু ভাবলে দেখবেন, (আমাদের মত) যারা ‘সময় নেই’, ‘সময় নেই’ বলে ছুটে বেড়াচ্ছে তারা তুচ্ছ ৮০-র নেশায় জরুরী ২০-র খেই হারিয়ে ফেলছে।

তবু, মানসিক অবস্থা যদি ৮০/২০-র অল্পে সুখহীন, অতৃপ্ত থেকে যায় এবিসি’তে যান (পাশের ছবি)। প্রায় অর্ধশতক পরে প্যারেটোর ৮০/২০ নীতির লেজ ধরে তিন রকম গ্রুপ করার এই প্রণালীটির উদ্ভব হয়েছিল স্টক ম্যানেজমেন্ট-এর জন্য। দেখা যায়, সাধারণভাবে কোন কোম্পানির স্টকের ১০% এর মূল্য মোট মূল্যের প্রায় ৭০%। তার মানে মাত্র ১০% জিনিষ বা বিষয়কে ঠিক মত ম্যানেজ করলেই ব্যবসা, ব্যক্তিগত বা জাতীয় জীবন খুব ভাল ভাবে চলতে পারে। আগের ২০% এতে ১০% এ নেমে যাওয়ায় আরও সময় বাঁচে।
(ছবির সুত্রঃ অ্রন্তর্জাল)
চলি (কিছু) নিয়মমতে
রোজ রোজ গালে হাত দিয়ে মস্তিষ্কে চাপ না দিয়ে কয়েকটা নিয়ম তৈরি করে নিলে মন্দ হয় না, যেমন-
সর্বোৎকৃষ্ট নয়, যথেষ্টের খোঁজ– এটিকে নিয়ম করে নিলে অনেক সময় বাঁচবে। যেমন, রাত বারোটার সময় লাচ্ছা পরোটা, রোগন জোশ আর রেড বুল এনার্জি ড্রিঙ্ক-এর খোঁজে বেরিয়ে তন্দুরি-রুটি আর তড়কা দেওয়া ডাল পেয়ে খুশি হয়ে যাব।
‘অতীতের কথা যত ভুলে যাও একে একে’- তখন এটা করলাম, এখন দেখছি ওটা করলে ভাল হ’ত। অনন্ত রকমফের আর প্রতি দিনই আগের দিনের চেয়ে আরো উন্নত, আরো ফ্রিজ-ফোন-ল্যাপটপ আবির্ভূত হবার যুগে পিছন ফিরে দেখার ভয়ানক আর সাধারণতঃ নিরর্থক সময়হন্তারক স্বভাব থেকে ছাড়ান পাওয়া অতি প্রয়োজন। আমার “না হয় যা হয়েছে তাই হ’ল আরো কিছু না’ই হ’ল” গানটির দ্যোতনা ব্যর্থতার নয়, পরিতৃপ্তির।
সময়সীমা– হোটেলের মেনু দেখে কি খাব, ১৫ মিনিটে ঠিক করে ফেলা, কাপড় কিনতে গিয়ে মাত্র তিন/চারটি দোকান দেখে সেরে নেওয়া, দিনে কত মিনিট ঝুল ঝাড়ব, বই পড়ব বা রান্না করব ঠিক করে ফেলা, তন্দুরি বা তাইওয়ানিজ খাবার কিনতে বসে কতক্ষণ অন্তর্জালে মাকড়সা হয়ে ঝুলতে থাকব এগুলো আগে থেকে ঠিক করে নেওয়া বেশ কাজের।
বিবিধ বিধি- সমাজ আর সরকারও বেশ কিছু নিয়ম তৈরি করে দেন, যেমন যাকে-তাকে তুই-তোকারি করা যাবে না, রাস্তাঘাটে রাগ হলেই কোন অনুষ্ঠান ছাড়াই কারো সাথে শ্যালক ধরণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ঘোষণা করা যাবে না ইত্যাদি প্রাচীন প্রথা তো আছেই। আধুনিকের মধ্যে করোনার ভ্যাকসিন না নিলে ট্রেনে বা প্লেনে চড়া যাবে না, মল-এ সিনেমা দেখা যাবে না। বিস্কুট বা বুটজুতো যা-ই চান ট্যাক্স না দিলে কেনা যাবে না, প্রেম যতই উত্তাল হোক না কেন, ১৮ বছরের চেয়ে ছোট কাউকে বিয়ে করা বা বহুবিবাহ করা যাবে না অথবা ব্যবসা বা দোকানে তাদের কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করা যাবে না ইত্যাদি। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাব, না লাইসেন্স নিয়ে তা নিয়ে সময় নষ্ট করার উপায় আর কোন সভ্য দেশে নেই।
লক্ষ্য করলে দেখবেন, ওপরের আপাত সহজ নিয়মগুলো বেছে নেওয়ার পরিধি ছোট করে আমাদের সময় বাঁচায়। কিন্তু, এগুলো মেনে চলা সহজ নয় বলেই আমরা চিরকালের অভিমন্যু। সহজ পাঠ থেকে শুরু করে অগুন্তি সর্বজনবোধ্য সাহিত্য সৃষ্টি করা রবীন্দ্রনাথও লিখেছেন, “সহজ করে লিখতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না লেখা সহজে।”
শেষ কথাটি
পাঁউরুটি আর প্রথম শীতের ঝোলা গুড় খেয়ে ভাবতে ভাবতে লিখতে লিখতে রকমফেরের অত্যাচার থেকে বাঁচার পাঁচটি ধাপ চিত্তমাঝে প্রকট হ’ল।
প্রথম- অহংকার ত্যাগ আর বিনয় অর্জন।
দ্বিতীয়- নিখুঁতের মায়াহরিণীকে শেষ কথাটি বলে দেওয়া-
যতই কাছে নেচে বেড়াও, এই কথাটি জেনো-
তোমায় ধরতে আমি আর ছুটবো না কক্ষনো।
তৃতীয়- যা চাই আর যা প্রয়োজন- এ দু’টির মধ্যে ফারাকটি বোঝা।
চতুর্থ- ৮০/২০ বা এবিসি প্রয়োগ করে কোথায় বেছে নেব, কোথায় ছেড়ে দেব- ঠিক করে ফেলা।
পঞ্চম-ওপরের কাজগুলো করে ফেলার ফলে যে সময় বাঁচবে তা অন্য অনেক পার্থিব শখ মেটানোর ব্যস্ততায় বা কিছুই না করার স্বর্গীয় আলস্যে অতিবাহিত করা।
-অরিজিৎ চৌধুরী
“এইটুকু মোর শুধু রইলো অভিমান”– এন্তার বকবক করি, বিতর্কিত বিষয়ও ছাড়ি না। সন্দেহ হয়, মাঝে কেউ কেউ পড়েও ফেলেন। কিন্তু, ব্লগের নীচে মতামতের ঝড় ওঠা তো দূরস্থান, পাতাটিও নড়ে না। বিরাগ (বিশেষতঃ) নির্দ্বিধায় উচ্চারিত হোক। আমার মত লেখক বিরোধের ভাগীরথীতে স্নান না করলে দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ে যে। একটি শের মনে পড়ছে…
‘যদি আর কিছুই না থাকে, অন্ততঃ শত্রুতাটুকূ থাক,
না হলে কি করে বলব তোমার সাথে কিছুমাত্র সম্পর্ক ছিল আমার।‘ (স্মৃতির উদ্ধৃতি)
-শুভেচ্ছারাশি।।
About the author

Arijit Chaudhuri, located in Navi Mumbai, petroleum geologist by profession. Also interested in issues concerning pollution, climate change and fast depleting groundwater reserves.Travelling, reading, writing articles, composing rhymes and recitation are his hobbies.

তোর লেখা পড়ার পর সেটা হজম করতে আমার অনেক সময় লাগে।তুই যা যা লিখিস তুইও জানিস ওনার মতন ” আজি হতে শতবর্ষ পরে” এর মতন সেটা অমোঘ সত্য হয়ে প্রকাশ পাবে।
লিখে যা শুধু লিখে যা ।
আমাকে কিছু কমেন্ট করার আগে দশবার ভাবতে হয় ” আমি ঠিক ঠাক বুঝেছি তো”?
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আমার মত লোকের পক্ষে পড়িয়ে ফেলা এক মহা সার্থকতা। তার পর ঠিক কি লিখতে চেয়েছি সেটা বোঝাতে পারা লেখকের স্বর্গপ্রাপ্তি। ভাববো…চেষ্টা করবো আরো। দেখি..
জমজমাট লেখা। কল্যাণকর উপদেশ। কিন্তু এগুলো আত্মায়িত করতে হলে লেখকের মত মহৎ চিল্তাশক্তির অধিকারী হতে হবে। আমরা লোভী বাউল্ডুলে ভীতু ও অসহায় সাধারণ জনতা কি এসব ভালো কথা মনে রাখবে? অনেকের মতে পাবলিককে …. বৃন্দাবন দেখানোই প্রকৃষ্ট উপায়। লেখক কি বলেন?
উপদেশ দেওয়া ডাক্তার-অধ্যাপক-দার্শনিকের কাজ, ব্লগ লেখকের নয়। তাদের কাজ হ’ল নানা রকম তথ্য আর রাস্তা, মায় যে পথ সে নিজেও মাড়ায় নি, তাকে শুদ্ধ, বাৎলে এর “পরে যাও যেথায় খুশি জ্বালিয়ো না কো মোরে” ভাবে বকবকানির অন্ত করা।
আপনাকে নিয়ে দ্বিতীয় জন ‘উপদেশ’ প্রসঙ্গ তুললেন। দেখি…
লোভী, বাউন্ডুলে, ভীতু আপনার ব্যক্তিগত বিনয়.. তবু আন্দাজ করি, পৃথিবীতে তেমন মানুষ অনেক। তবু মানুষের দুনিয়া মোটামুটি চলছে- এগোচ্ছে না যে এমনও বলতে পারছি না। তা ছাড়া, “তোমার হাতে নাই ভুবনের ভার” এ রকম দায়িত্বহীন মুক্ত ভাব না থাকলে কী-প্যাডে আঙুল নির্বাধ চলে না যে…
সত্যি খুব সুচিন্তিত, তথ্যসমৃদ্ধ এবং মোটামুটি তর্কাতীত লেখা। তবে রবীন্দ্রনাথেরই একটা কথা দিলে এক কথায় ব্যাপারটা বোঝা যায়। সেটাই শুধু যোগ করে দিচ্ছি।
যথাসাধ্য ভালো বলে, ওগো আরো ভালো,
কোন্ স্বর্গপুরী তুমি করে থাকো আলো?
আরো ভালো কেঁদে কহে, আমি থাকি হায়
অকর্মণ্য দাম্ভিকের অক্ষম ঈর্ষায়।
ভালো লাগার জন্য একঝুড়ি ধন্যবাদ। রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি’র জন্য আর এক ঝুড়ি। এরকম মতামত ভাবনাকে সমৃদ্ধ করে।
আমার পুরোনো মতে আমি অটল থাকলাম – এঁর লেখা বেশী গ্রে ম্যাটার দাবী করে পাঠকদের থেকে।
তাতে অবশ্য পাঠকেরাও মগজে শান দেবার সুযোগ পায়।
-অমিতাভ মৈত্র
কঠিন কথাকে কঠিনতর জারগন জংগলে ঠেলে না দিয়ে জলবৎ ঝলমল গদ্যে বলে ফেলা শুধু পড়া নয় ভাবার খোরাক যোগায় নিয়মিত।
সব পড়ি “বাক্যহারা” হয়ে।